ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব
(সম্প্রতি নানানভাবে পত্র-পত্রিকায় একটি গবেষণার খবর এসেছে যেখানে নিয়েনডারথাল মানুষের জিনরূপের সাথে কভিড-১৯ এর ঝুঁকি'র সম্পর্ক নিয়ে একটি গবেষণাকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। বিষয়টি এখানে যথসম্ভব সহজভাবে উপস্থাপন করা হলো।)
৬০ হাজার আগে হোমো নিয়েনডারথাল মানুষ থেকে বর্তমান হোমো সেপিয়েন্স মানুষের ভেতরে আসা ডিএনএ'র একটি অংশ কোভিড-১৯ রোগের সংকট নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানিরা।
প্রাচীন মানুষের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাকারীদের পুরোধা বিজ্ঞানী সান্তে পাবো'র নেতৃত্বে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্রের খসড়া
বায়োআর্কাইভ-এ প্রকাশিত হয়েছে। পাবো'র সাথে মূল গবেষক ছিলেন হুগো জেবার্গ।
উক্ত গবেষণার সঙ্গে সংযুক্ত নন, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একজন জিনতত্ত্ববিদ জোশুয়া আকেয় বলেছেন, দেখা যাচ্ছে, ৬০ হাজার বছর আগের হোমো নিয়েনডারথাল মানুষের সাথে হোমো সেপিয়েন্স মানুষের আন্তঃপ্রজনন প্রক্রিয়াটি আজও প্রভাব ফেলছে।
জেবার্গ এবং পাবো তাদের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে নিয়েছেন নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ গত ১৭ জুন ডেভিড এলিঙহস কর্তৃক প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রকে (DOI: 10.1056/NEJMoa2020283)। এই গবেষণায় এলিঙহস এবং তার সহযোগিরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের কোষের ৩ নম্বর ক্রোমোজমের 3p21.31 অংশে কিছু পরিবর্তন কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর সমস্যায় নিপতিত হন তাদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়।
এখন জেবার্গ এবং পাবো বলছেন, মানুষের কোষের ৩ নম্বর ক্রোমোজমের উক্ত 3p21.31 অংশের পরিবর্তনগুলো আসলে প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষের ভেতরে এসেছে হোমো নিয়েনডারথালদের কাছ থেকে। বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়ায় আবিষ্কৃত হোমো নিয়েনডারথাল-এর নমুনা Vindija 33.19 এর ডিএনএ-তে ৩ নম্বর ক্রোমোজমের উক্ত পরিবর্তিত রূপ (এ্যালিল) দেখা যায়। সাইবেরিয়া অঞ্চলের নিয়েনডারথাল মানুষের নমুনায় এই পরিবর্তনগুলো কম এবং ডেনিসোভান নামে আরেক ধরেনের প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ভেতর এই পরিবর্তন একেবারেই অনুপস্থিত। ক্রোমোজম ৩ এর উক্ত অংশে ছয়টি জিন রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-SLC6A20, LZTFL1, CCR9, FYCO1, CXCR6, and XCR1। বিজ্ঞানীরা এসব জিন কোভিড-১৯ এর গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সাথে যুক্ত থাকতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন।
১০০০-জিনোম প্রজেক্ট- (1000 genome project)-এর অধীনে প্রকাশিত মোট ৫০০৮ টি মানব জিনোম তথ্যের সাথে তুলনা করে জেবার্গ এবং পাবো বলছেন, কভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষে শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত ক্রোমোজম ৩ এর উক্ত পরিবর্তনগুলো এশিয়া এবং ইউরোপের মানুষের ভেতর সবেচেয়ে বেশি পরিমানে দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের ৬৩ শতাংশের ভেতর উক্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর কমপক্ষে একটি রয়েছে। যদিও এসব পরিবর্তন আসলে মানুষের ভেতর কেমন ভূমিকা রাখবে সে সম্বন্ধে এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আরো গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ক্রোমোজমের এই পরিবর্তন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তবে অন্যত্র এই পরিবর্তন অনেক কম দেখা যায়। মাত্র ৮ শতাংশ ইউরোপীয় এটা বহন করে, এবং পূর্ব এশিয়ায় মাত্র ৪ শতাংশ মানুষে এটা আছে। এসব পরিবর্তন আফ্রিকায় প্রায় পুরোপুরি অনুপস্থিত।
এখানে মনে রাখা দরকার যে, পৃথিবীর মানুষদের খুব নগন্য সংখ্যক সম্পূর্ণ জিনোম তথ্য এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। তার ভেতরে বাংলাদেশের মানুষের জিনোম তথ্য ১৪৪ টি (
https://www.coriell.org/1/NHGRI/Collections/1000-Genomes-Collections/1000-Genomes-Project) হওয়ার কথা। ১৪৪টি জিনোমের ওপর ভিত্তি করে টানা উপসংহারকে খুব আস্থার সাথে নেয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং বাংলাদেশিদের কভিড-১৯ এর ঝুঁকি বেশি বিষয়ক যে তথ্য প্রচার হচ্ছে সেটাকে আরো গবেষণার জন্য রেখে দিতে হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযু্ক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়